লন্ডন, ১৫ জুলাই : বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেছেন, বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কাজের শ্লথ গতি দুর্নীতির চেয়েও ভয়াবহ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্যন্নোয়নে বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে ফাইলের শ্লথ গতির কারণে তা অনেক সময় কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে সময় নিচ্ছে অনেক বেশি। গত বৃহস্পতিবার, ১১ই জুলাই পূর্ব লন্ডনের লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে বাংলা সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময়ে এই মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে প্রেসক্লাব কার্যালয়ে এসে পৌছালে মন্ত্রীকে স্বাগত জানান ক্লাব নেতৃবৃন্দ।
প্রেসক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুবায়েরের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। এসময় তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন সাংবাদিকদের সামনে। সিলেট বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু, ব্রিটেনে তৈরী হওয়া মেধাবী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রজন্মকে দেশের কাজে লাগানো, নিজ এলাকাসহ বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন পরিকল্পনা মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের কথা তুলে ধরতে গিয়ে এসময় মন্ত্রী বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌছাতে বিরামহীন কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী।’ বাংলাদেশ আর আগের অবস্থানে নেই মন্তব্য করে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ‘এক সময় দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত দেশ হিসেবে যে পরিচয় ছিলো বাংলাদেশের, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তা থেকে বেরিয়ে এসেছি আমরা।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা, খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা, সারা দেশের প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন বাংলাদেশে আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা।’ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সন্ত্রাসী তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি অন্ধকার দিক নিয়ে আমাদের শঙ্কা ছিলো সবচেয়ে বেশি, সরকার এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে, যদিও নিয়ন্ত্রণে আনার পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকেরই দ্বিমত বা সমালোচনা আছে। আর্টিজানের মত মানুষ জবাই করা ঘটনার পর কঠোর না হয়ে উপায় ছিলোনা সরকারের।’ তিনি বলেন, ‘আইন শৃঙ্খলার এই ক্ষেত্রে সফলতা আমরা দেখছি।’ শিশু ধর্ষণের মত ঘটনা রোধে কঠোর আইন আসছে, এমনটি জানিয়ে এম এ মান্নান বলেন, ‘কোন বিষয় যখন আদালতে চলে যায়, তখন সরকারের আর কিছু করার থাকেনা। সরকার শুধু ঘটনার সাথে জড়িতদের আটক করে আদালতে সোপর্দ এবং প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে পারে।’

শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার কথা জানিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘মাতৃভাষা শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই সরকার জাতিকে শিক্ষিত করতে চায়। এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে যৌথ সহযোগিতার ভিত্তিতে আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া হয়।’ এ বিষয়ে বহির্বিশ্বে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের যেকোন পরামর্শ গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন পরিকল্পনামন্ত্রী। বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী ড. দীপু মনি একজন আধুনিক ও করিৎকর্মা রাজনীতিক, বহির্বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যার রয়েছে বিশেষ জ্ঞান, তিনি নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা সাজাবেন।’
সিলেট থেকে সরাসরি বিমান ফ্লাইট আর কত দূর? এমন অপর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান কাজ চলছে। বলেন, ‘কাজের শ্লথ গতির কারনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তিরস্কারও করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিমান সিলেটে গিয়ে সরাসরি নামতে পারলে সিলেট থেকে সরাসরি উঠতে পারেনা কেন, এমনটি জানতে আমরা খোঁজ খবর নিয়েছি। আসলে সিলেট গিয়ে যখন নামে তখন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পথে থাকায় বিমানটি হাল্কা থাকে, এজন্য নামা সহজ হয়। কিন্তু উঠার সময় জ্বালানি ভর্তি থাকায় বিমানের ওজন থাকে বেশি। এই ওজন নিয়ে উড়তে গেলে যে রানওয়ের প্রয়োজন সেটি এখনও তৈরী হয়নি সিলেটে। তাছাড়া সিলেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একাজগুলো সম্পন্ন হলেই, সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে সরাসরি উড়বে বিমান।’ তাঁর নিজ এলাকাসহ সিলেটের বিভিন্ন সড়কের বেহাল অবস্থার বিষয়েও প্রশ্নের সম্মুখীন হন পরিকল্পনা মন্ত্রী। জানান, সিলেটে সড়ক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সমস্যা ঠিকাদার ও কাজের লোকের অভাব। অন্য জেলা থেকে ঠিকাদার ও কাজের লোক এনে কাজ করাতে হয়। তবে কাজ চলছে, সড়কগুলোর এই অবস্থা থাকবেনা বলে সাংবাদিকদের আশ্বাস দেন মন্ত্রী।

সিলেট বিমান বন্দর সড়কে পর্যাপ্ত লাইট না থাকায় রাতের বেলা তা অন্ধকার থাকে, এমন অভিযোগও শুনতে হয় পরিকল্পনা মন্ত্রীকে। উত্তরে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হকের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমাদের মেয়রতো খুবই করিৎকর্মা মানুষ। নিশ্চয়ই এটি তাঁর নজরে পড়েনি। বিষয়টি মেয়রের নজরে নিয়ে আসবো আমি, সবধরনের সহযোগিতাও করবো তাঁকে।’ অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে এম এ মান্নান আরো বলেন, ‘ভারতের মত দেশে প্রতি স্কয়ার মাইলে যেখানে ৪০ জন মানুষের বসবাস, সেখানে আমাদের দেশে বসবাস করে ১২শ জন। আমাদের জমির পরিমাণ খুবই সিমীত। এই সীমিত জমি অধিগ্রহণ করে নতুন সড়ক করা খুবই কঠিন। যে সড়কগুলো আছে তাঁর রক্ষনাবেক্ষণেই এই মুহূর্তে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।’ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মালিকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, মন্ত্রীর কাছে এমন অভিযোগ তুললে তা তিনি দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করেন। বলেন, ‘সরকার এক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের তিনগুণ মূল্য পরিশোধ করছে।’ এমন ঘটনা ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এমন ঘটনার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগি কারো হয়তো ভূমিকা থাকতে পারে।’ মতবিনিময় সভার সমাপনী বক্তব্যে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে আসায় মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান ক্লাব সভাপতি মোহাম্ম এমদাদুল হক চৌধুরী। তিনি এসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর পাশাপাশি ব্রিটেন-বাংলাদেশ কুটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি ও লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের রজত জয়ন্তীর আনুষ্ঠানিক উদযাপনে মন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসনের লেখা ‘লন্ডনে মাওলানা ভাসানী’ বইয়ের একটি কপি ও ‘দর্পণ’ ম্যাগাজিনের পক্ষে একটি ক্রেস্ট মন্ত্রীর হাতে তুলে দেন বইটির লেখক ও দর্পণ সম্পাদক।